আপনজনের গন্ধ
চোখ থেকে চশমাটা খুললেন পৃথ্বীশবাবু। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘর থেকে বেরোনোর সময় বৃষ্টি ছিল না। তবে আকাশ মেঘলা ছিল সামান্য, সাথে রোদের লুকিয়ে ফেলা মুখের রেশটুকু।
বাগানের পেছনে এদিকটায় সুন্দর একটি আয়তাকার অংশ গ্রিলের বেড়া দেওয়া আর তার দু-দিকে দু-টি গেট। একটা গেটের সামনে থেকে পরিপাটি করে বাঁধানো একটি সরু রাস্তা গিয়ে মিশেছে মানুষের চলা পথে আর একটা গেট পৃথ্বীশবাবুর বাগানের দিকে যার তালা খুলে সবেমাত্র ঢুকেছেন বছর সত্তরের পৃথ্বীশবাবু। সামনে আয়তকার অংশটির ঠিক মাঝামাঝি একটি সমাধি ও তার শিয়রে একটি গাছ।
পৃথ্বীশবাবু মনে মনে ফিরে গেলেন ছত্রিশটা বছর পেছনে।
* * *
প্রাণাধিক প্রিয় বন্ধু বিজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সবে শ্মশান থেকে ফিরেছেন পৃথ্বীশ। প্রায় সন্ধে হবে হবে, অন্ধকার যেন এক্ষুনি ঝুপ করে নেমে এসে জড়িয়ে নেবে চারদিক। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়েছেন পৃথ্বীশ। এবার যেন মনে পড়ছে যত পুরোনো স্মৃতি, বিজনের স্মৃতি, বিজনের কবিতা, গালাগাল দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া বিজনের না-হওয়া কবিতাগুলো আর আরও অনেক অনেক কথার মাঝে হেসে উড়িয়ে দেওয়া বছরখানেক আগের একটি কথা।
একদিন হঠাৎই ফোন করে বিজন যেন কেমন ধরা গলায় গড়গড় করে বলে গিয়েছিল কথাগুলো,
"একটা কথা বলছি তোকে, আমি মারা গেলে আমার নামে একটা সমাধি বানাস। আর সেই সমাধির মাথার কাছে একটা বকুল গাছের চারা বসাস। আর সমাধির উপর লিখে দিস যে, যাদের কেউ আপন নেই তারা এই সমাধির পাশে এসে কিছুক্ষণ যেন বসে থাকে। আর ফেরার সময় সমাধির উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা বকুলগুলোর মধ্যে থেকে একটা যেন সঙ্গে নিয়ে যায়। ওই ফুলটার গন্ধ বাকি সারাটাজীবন তাদের আপন হয়ে থেকে যাবে..."
সেদিন হেসে, বকাবকি করে উড়িয়ে দিলেও আজ পৃথ্বীশ ঠিক করে ফেলেন বন্ধুর এই ইচ্ছাটা তিনি রাখবেন, রাখতেই হবে তাঁকে, তাতে দশজনে দশকথা বলবে, রসিকতা করবে, কিন্তু তিনি পিছিয়ে আসবেন না।
* * *
আচমকা গায়ের উপর দু-তিনটে বকুল একসঙ্গে ঝরে পড়াতে সম্বিৎ ফিরল পৃথ্বীশবাবুর। সারা সমাধিটা বকুলে ছেয়ে গেছে, মৃদু হাওয়া এসে মাঝে মাঝে সরিয়ে দিচ্ছে এপাশে ওপাশে থোকা থোকা বকুল। এই ছত্রিশ বছরে বহু মানুষকেই তিনি এই সমাধির পাশে এসে বসে থাকতে দেখেছেন, কেউ চেনা, কেউ-বা অচেনা, ফেরার সময় প্রত্যেককেই দেখেছেন সঙ্গে করে একটি, দু-টি বা কোঁচড়ভরতি করে ফুল নিয়ে যেতে।
নিঃসন্তান পৃথ্বীশবাবু বিপত্নীক হয়েছেন সপ্তাহ তিনেক হল। আজ তিনি যথার্থই একা। আপন বলতে আর কেউ নেই। ঘরে একদমই আর মন টিকছিল না এই একাকিত্বে, তাই অনেকদিন বাদে আজ এখানে এলেন।
ধীরে ধীরে সমাধির পাশে বসলেন পৃথ্বীশবাবু। মুঠো করে সমাধির উপর থেকে কিছু ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ধরলেন নাকের সামনে। মৃদু হাওয়ায় একটা গন্ধ ভেসে এলো। বকুলের মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে আরও একটা গন্ধ... খুব পরিচিত... আপনজনের গন্ধ...

অনুভূতিশীল গল্প।
ReplyDeleteভালবাসা
Deleteসঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের গল্পের চরিত্রদের মত।
ReplyDeleteমাপা হাসি-চাপা কান্না নিয়ে। শ্মশান এক অদ্ভুত দর্শন ধারণ করে থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ একখানা থাকলে তপভূমির মত মনে হয়।
বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বাঁকুড়ায়... পরিত্যক্ত শ্মশান দেখেছি, থেকেছি। অবশেষ।
ভালো লাগল পড়ে। মানুষের একা হয়ে যাওয়া, যাকে স্পর্শ করেছে সে-ই বুঝতে পারে।
বড় প্রাপ্তি
Deleteতোর লেখা বরাবরই আমার ভীষন প্রিয়❤
ReplyDeleteভালো লিখেছ। তবে চশমা লিখবে চশমাটা লিখবে না। অনুভূতিপ্রবণ মনের সুন্দর প্রকাশ একটি গল্পকে ধরে।
ReplyDelete